মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানুষ আর কাকের অদ্ভুত বন্ধন

এক বছর আগে কালবৈশাখী ঝড়ে বাসা থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছিল একটি কাকের ছানা। অসহায় সেই ছানাটিকে উদ্ধার করে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন শুরু করেন বাগেরহাট শহরের লঞ্চঘাট এলাকার দর্জি রুনু দেবনাথ। এখন সেই কাকই সবার কাছে পরিচিত ‘টুটু’ নামে।

বাগেরহাট শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় ছোট্ট একটি দর্জির দোকান রয়েছে রুনু দেবনাথের। তিনি বলেন, ঝড়ে আহত অবস্থায় পড়ে থাকা কাকের ছানাটিকে উদ্ধার করে চিকিৎসা ও যত্ন করে সুস্থ করে তোলেন তিনি। সুস্থ হওয়ার পরও কাকটি তাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি। ধীরে ধীরে টুটু হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী।

দিনভর দোকানে রুনুর সঙ্গেই সময় কাটায় টুটু। কখনও তার কাঁধে বসে থাকে, কখনও দোকানের ভেতর উড়ে বেড়ায়, আবার কখনো খুনসুটিতে মাতিয়ে রাখে আশপাশের সবাইকে। রুনু দোকান থেকে কোথাও বের হলে টুটুও তার পিছু নেয়।

টুটুর ভালোবাসা আর দুষ্টুমিতে প্রতিদিন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে লঞ্চঘাট এলাকার পরিবেশ। আশপাশের দোকানদাররাও কাকটিকে আপন করে নিয়েছেন। মানুষ ও একটি কাকের এমন স্নেহময় সম্পর্ক দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন অনেকে। কেউ ছবি তোলেন, কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখেন টুটু আর রুনুর মায়ার বন্ধন।

মানুষ আর প্রাণীর সম্পর্ক যে শুধু খাবার বা আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ভালোবাসা আর মমতাও যে গড়ে তুলতে পারে গভীর বন্ধন— তার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন বাগেরহাটের রুনু দেবনাথ ও তার প্রিয় কাক টুটু।

পাশের দুলাল পরামানিক সেলুনের মালিক বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম সুস্থ হলেই কাকটা উড়ে চলে যাবে। কিন্তু এখন দেখি রুনু দাদার সঙ্গে ওর সম্পর্কটা মা-সন্তানের মতো। কেউ রুনু দাদাকে বকা দিলেও টুটু রেগে যায়। আবার আমাদের সঙ্গে মজাও করে। ছোট বাচ্চাদের খুব পছন্দ করে।

এক পথচারী সাগর হোসেন বলেন, এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। মানুষ আর একটা কাকের মধ্যে এত মায়া-মমতা সত্যিই অবাক করার মতো। নিজের চোখে দেখেছি, কেউ মারতে গেলে টুটু রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। মানুষের ভালোবাসা পেলে প্রাণীরাও যে আপন হয়ে ওঠে, এটি তার প্রমাণ।

রুনু দেবনাথ বলেন, প্রথমে ভাবিনি ও বাঁচবে। খুব অসহায় অবস্থায় ছিল। নিজের সন্তানের মতো করে যত্ন করেছি বলেই হয়তো আজও আমার সঙ্গ ছাড়েনি। এখন ওকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও ভালো লাগে না। আমি ডাক দিলেই উড়ে এসে কাঁধে বসে পড়ে। কেউ যদি আমাকে মারার ভানও করে, সঙ্গে সঙ্গে তেড়ে যায়। যেন আমাকে পাহারা দেয়।

তিনি আরও বলেন, আমার দুই সন্তান আছে— একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। কিন্তু টুটুকেও আমি আমার সন্তানের মতোই মনে করি। ২২ বছর ধরে এই দর্জির কাজ করে সংসার চালাই। দিনের বেশিরভাগ সময় দোকানেই কাটে। টুটু আমার সঙ্গী হয়ে আছে সবসময়। মাঝে মাঝে কোথা থেকে ছোট ছোট ফুল এনে আমাকে সাজিয়ে দেয়। তখন মনে হয় ও যেন ভালোবাসা প্রকাশ করছে। এখন টুটু আমার সবকিছু।

Tag :
জনপ্রিয়
PhotoCard Icon
Create PhotoCard

মানুষ আর কাকের অদ্ভুত বন্ধন

আপডেট সময় : ১১:৩৭:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

এক বছর আগে কালবৈশাখী ঝড়ে বাসা থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছিল একটি কাকের ছানা। অসহায় সেই ছানাটিকে উদ্ধার করে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন শুরু করেন বাগেরহাট শহরের লঞ্চঘাট এলাকার দর্জি রুনু দেবনাথ। এখন সেই কাকই সবার কাছে পরিচিত ‘টুটু’ নামে।

বাগেরহাট শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় ছোট্ট একটি দর্জির দোকান রয়েছে রুনু দেবনাথের। তিনি বলেন, ঝড়ে আহত অবস্থায় পড়ে থাকা কাকের ছানাটিকে উদ্ধার করে চিকিৎসা ও যত্ন করে সুস্থ করে তোলেন তিনি। সুস্থ হওয়ার পরও কাকটি তাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি। ধীরে ধীরে টুটু হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী।

দিনভর দোকানে রুনুর সঙ্গেই সময় কাটায় টুটু। কখনও তার কাঁধে বসে থাকে, কখনও দোকানের ভেতর উড়ে বেড়ায়, আবার কখনো খুনসুটিতে মাতিয়ে রাখে আশপাশের সবাইকে। রুনু দোকান থেকে কোথাও বের হলে টুটুও তার পিছু নেয়।

টুটুর ভালোবাসা আর দুষ্টুমিতে প্রতিদিন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে লঞ্চঘাট এলাকার পরিবেশ। আশপাশের দোকানদাররাও কাকটিকে আপন করে নিয়েছেন। মানুষ ও একটি কাকের এমন স্নেহময় সম্পর্ক দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন অনেকে। কেউ ছবি তোলেন, কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখেন টুটু আর রুনুর মায়ার বন্ধন।

মানুষ আর প্রাণীর সম্পর্ক যে শুধু খাবার বা আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ভালোবাসা আর মমতাও যে গড়ে তুলতে পারে গভীর বন্ধন— তার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন বাগেরহাটের রুনু দেবনাথ ও তার প্রিয় কাক টুটু।

পাশের দুলাল পরামানিক সেলুনের মালিক বলেন, প্রথমে ভেবেছিলাম সুস্থ হলেই কাকটা উড়ে চলে যাবে। কিন্তু এখন দেখি রুনু দাদার সঙ্গে ওর সম্পর্কটা মা-সন্তানের মতো। কেউ রুনু দাদাকে বকা দিলেও টুটু রেগে যায়। আবার আমাদের সঙ্গে মজাও করে। ছোট বাচ্চাদের খুব পছন্দ করে।

এক পথচারী সাগর হোসেন বলেন, এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। মানুষ আর একটা কাকের মধ্যে এত মায়া-মমতা সত্যিই অবাক করার মতো। নিজের চোখে দেখেছি, কেউ মারতে গেলে টুটু রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। মানুষের ভালোবাসা পেলে প্রাণীরাও যে আপন হয়ে ওঠে, এটি তার প্রমাণ।

রুনু দেবনাথ বলেন, প্রথমে ভাবিনি ও বাঁচবে। খুব অসহায় অবস্থায় ছিল। নিজের সন্তানের মতো করে যত্ন করেছি বলেই হয়তো আজও আমার সঙ্গ ছাড়েনি। এখন ওকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও ভালো লাগে না। আমি ডাক দিলেই উড়ে এসে কাঁধে বসে পড়ে। কেউ যদি আমাকে মারার ভানও করে, সঙ্গে সঙ্গে তেড়ে যায়। যেন আমাকে পাহারা দেয়।

তিনি আরও বলেন, আমার দুই সন্তান আছে— একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। কিন্তু টুটুকেও আমি আমার সন্তানের মতোই মনে করি। ২২ বছর ধরে এই দর্জির কাজ করে সংসার চালাই। দিনের বেশিরভাগ সময় দোকানেই কাটে। টুটু আমার সঙ্গী হয়ে আছে সবসময়। মাঝে মাঝে কোথা থেকে ছোট ছোট ফুল এনে আমাকে সাজিয়ে দেয়। তখন মনে হয় ও যেন ভালোবাসা প্রকাশ করছে। এখন টুটু আমার সবকিছু।