বাসার প্লাস্টিকের যে চেয়ারটি অনেক বছর ব্যবহারের পর ভেঙে গিয়েছিল, তা হয়তো বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল কোনো এক ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীর কাছে। এখন কয়েক হাত ঘুরে এর ঠাঁই হয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে। যেখানে স্তূপ হয়ে আছে পলিথিন, বালতি, ড্রাম, বোতলসহ নানান ধরনের পুরোনো প্লাস্টিক। সাধারণ চোখে এগুলো বর্জ্য হলেও, এখানে তা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হয়ে ফিরে পাচ্ছে নতুন রূপ।
রিসাইক্লিং প্ল্যান্টের বিশাল মেশিনের ভেতরে ফেলে চূর্ণ করা, পানি দিয়ে ধোয়া, শুকানো ও গলানোর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এসব প্লাস্টিক পরিণত হচ্ছে নতুন পণ্য তৈরির মূল কাঁচামালে। সেই কাঁচামাল দিয়েই আবার তৈরি হচ্ছে চেয়ার-টেবিল, ফুলের টব, ময়লার ঝুড়ি, মুরগির খামারের পাত্র, বাগানের জিনিসপত্রসহ শতাধিক সামগ্রী।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ঘুরে এই কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে। জানা গেছে, সেখানে কীভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এক সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পণ্য ব্যবহারের পর বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে সম্পদে পরিণত করা হয়। ফলে পরিবেশ দূষণ কমে এবং হ্রাস পায় কার্বন নিঃসরণ।
র্তমানে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার ৭৫০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করছে, যা বছরে প্রায় ৬৯ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছাচ্ছে। এই পরিমাণ প্লাস্টিকের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলে বছরে ৪০০ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হতো। এখন উৎপাদন ব্যয় কমছে। ফলে দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
আমরা প্রতিদিন প্লাস্টিক আলাদা করা ও মেশিনে দেওয়ার কাজ করি। আগে জানতাম না প্লাস্টিক আবার এভাবে ব্যবহার করা যায়। এখন বুঝতে পারি, এগুলো পরিবেশের জন্যও ভালো।- রিসাইক্লিংয়ে যুক্ত কর্মী শিউলি আক্তার
যাত্রা শুরু যেখান থেকে
মানুষের আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। তবে এর সুবিধার পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা দেশে এক বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এমন বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে শক্তিশালী সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তোলা সম্ভব।
এই ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ২০১২ সাল থেকে প্লাস্টিক রিসাইকেল কার্যক্রম শুরু করে। হবিগঞ্জে প্রায় এক হাজার ১০০ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত তাদের বৃহৎ শিল্প পার্কে উৎপাদন হয় বিভিন্ন ধরনের পণ্য। এখানেই গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ ও অত্যাধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট, যেখানে সারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক বর্জ্য নতুন আকারে ব্যবহার উপযোগী হয়ে ফিরে আসে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে কাজ
সরেজমিনে দেখা গেছে, রিসাইক্লিং সেন্টারে কর্মীরা তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে কাজ করছেন। মেশিনে পুরোনো প্লাস্টিক দেওয়া থেকে শুরু করে নতুন পণ্য তৈরি পর্যন্ত বিশাল এ কর্মযজ্ঞে কাজ করছেন সহস্রাধিক শ্রমিক।
রিসাইক্লিংয়ে যুক্ত কর্মী শিউলি আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন প্লাস্টিক আলাদা করা ও মেশিনে দেওয়ার কাজ করি। আগে জানতাম না প্লাস্টিক আবার এভাবে ব্যবহার করা যায়। এখন বুঝতে পারি, এগুলো পরিবেশের জন্যও ভালো।’
একই ইউনিটে কাজ করা মো. সোহেল মিয়া বলেন, ‘আগে এসব প্লাস্টিক ফেলে দেওয়া হতো। এখন এগুলো আবার নতুন পণ্য তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে। এখানে কাজ করে আমাদেরও আয়-রোজগারের সুযোগ হয়েছে।’













