শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দাকোপে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রেণু শিকার: তিন মাসে ৬ লক্ষ মিটার জাল জব্দ

  • অনলাইন ডেক্স
  • আপডেট সময় : ০৫:৫৮:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
  • ১০৮ Time View

খুলনার দাকোপ উপজেলার বিভিন্ন নদ-নদীতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবাধে চলছে বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু পোনা আহরণ। প্রশাসনের অভিযান ও জেল-জরিমানার ভয় থাকলেও জীবিকার তাগিদে জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিষিদ্ধ নেট জাল দিয়ে ধ্বংস করছেন মৎস্য সম্পদ।
সরেজমিনে উপজেলার পশুর ও ঢাংমারী নদীসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দিন-রাত সমানতালে চলছে রেণু আহরণের মহোৎসব।

বিশেষ করে উপজেলার বাণীশান্তা, ঢাংমারী, ঝালবুনিয়া, সুতারখালী ও কালাবগী এলাকায় কয়েকশ নারী-পুরুষ ও শিশুকে নিষিদ্ধ নেট জাল টেনে রেণু সংগ্রহ করতে দেখা যায়। জেলেরা একটি চিংড়ির রেণু ধরতে গিয়ে জালে আটকা পড়া শত শত প্রজাতির সাদা মাছের রেণু ও অন্যান্য জলজ প্রাণীকে ডাঙায় ফেলে ধ্বংস করছেন। এতে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন জেলে তাদের জীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে বলেন, “নদীতে নামলে কুমিরের ভয়, আবার পাড়ে উঠলে প্রশাসনের ধাওয়া। এত ভয়ের মাঝেও নদীতে নামি শুধু পেটের দায়ে। অভাবের সংসারে যখন কিছুই থাকে না, তখন এই রেণু ধরে যা পাই তাই দিয়েই চাল-ডাল কিনি। ১ হাজার পোনা ধরতে পারলে পাই ৭০০ টাকা। আমরা জানি এটা অপরাধ, কিন্তু আমাদের বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান তো নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলেরা নদী থেকে রেণু আহরণ করার পর তা সরাসরি বাজারে না নিয়ে স্থানীয় কিছু ফড়িয়া বা অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। এই ফড়িয়ারা গোপনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রেণু সংগ্রহ করে পরবর্তীতে ড্রামভর্তি করে বিভিন্ন ঘেরে বা বড় আড়তে পৌঁছে দেয়।

দাকোপ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আবুবকর সিদ্দিক জানান, “নদীতে নিষিদ্ধ নেট জাল ব্যবহার করে রেণু পোনা আহরণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং আমাদের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ছে। অবৈধ এই তৎপরতা বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং জব্দকৃত জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “গত তিন মাসে উপজেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে আমরা যৌথভাবে ১৬টি মোবাইল কোর্ট এবং ৬৩টি সফল অভিযান পরিচালনা করেছি।

এসব অভিযানে মোট ৬.১৭ লক্ষ মিটার অবৈধ কারেন্ট ও নেট জাল জব্দ করা হয়েছে। জেলেরা অনেক সময় গভীর রাতে রেণু আহরণ করায় তা শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও আমরা সাধারণ জেলেদের সচেতন করার পাশাপাশি তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করছি। দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমাদের এই কঠোর অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।”

পরিবেশবাদীরা বলছেন, কেবল অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। একদিকে যেমন ফড়িয়া ও মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে, অন্যদিকে প্রান্তিক জেলেদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান বা সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় দাকোপের নদ-নদীগুলো অচিরেই মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Tag :

কালীগঞ্জে ১৬তম বার্ষিক শ্রীশ্রী তারকব্রহ্ম হরিনাম সংকীর্তন ও লীলা কীর্তন অনুষ্ঠিত

PhotoCard Icon
Create PhotoCard

দাকোপে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রেণু শিকার: তিন মাসে ৬ লক্ষ মিটার জাল জব্দ

আপডেট সময় : ০৫:৫৮:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

খুলনার দাকোপ উপজেলার বিভিন্ন নদ-নদীতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবাধে চলছে বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু পোনা আহরণ। প্রশাসনের অভিযান ও জেল-জরিমানার ভয় থাকলেও জীবিকার তাগিদে জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিষিদ্ধ নেট জাল দিয়ে ধ্বংস করছেন মৎস্য সম্পদ।
সরেজমিনে উপজেলার পশুর ও ঢাংমারী নদীসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দিন-রাত সমানতালে চলছে রেণু আহরণের মহোৎসব।

বিশেষ করে উপজেলার বাণীশান্তা, ঢাংমারী, ঝালবুনিয়া, সুতারখালী ও কালাবগী এলাকায় কয়েকশ নারী-পুরুষ ও শিশুকে নিষিদ্ধ নেট জাল টেনে রেণু সংগ্রহ করতে দেখা যায়। জেলেরা একটি চিংড়ির রেণু ধরতে গিয়ে জালে আটকা পড়া শত শত প্রজাতির সাদা মাছের রেণু ও অন্যান্য জলজ প্রাণীকে ডাঙায় ফেলে ধ্বংস করছেন। এতে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন জেলে তাদের জীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে বলেন, “নদীতে নামলে কুমিরের ভয়, আবার পাড়ে উঠলে প্রশাসনের ধাওয়া। এত ভয়ের মাঝেও নদীতে নামি শুধু পেটের দায়ে। অভাবের সংসারে যখন কিছুই থাকে না, তখন এই রেণু ধরে যা পাই তাই দিয়েই চাল-ডাল কিনি। ১ হাজার পোনা ধরতে পারলে পাই ৭০০ টাকা। আমরা জানি এটা অপরাধ, কিন্তু আমাদের বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান তো নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলেরা নদী থেকে রেণু আহরণ করার পর তা সরাসরি বাজারে না নিয়ে স্থানীয় কিছু ফড়িয়া বা অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। এই ফড়িয়ারা গোপনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রেণু সংগ্রহ করে পরবর্তীতে ড্রামভর্তি করে বিভিন্ন ঘেরে বা বড় আড়তে পৌঁছে দেয়।

দাকোপ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আবুবকর সিদ্দিক জানান, “নদীতে নিষিদ্ধ নেট জাল ব্যবহার করে রেণু পোনা আহরণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং আমাদের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ছে। অবৈধ এই তৎপরতা বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং জব্দকৃত জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “গত তিন মাসে উপজেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে আমরা যৌথভাবে ১৬টি মোবাইল কোর্ট এবং ৬৩টি সফল অভিযান পরিচালনা করেছি।

এসব অভিযানে মোট ৬.১৭ লক্ষ মিটার অবৈধ কারেন্ট ও নেট জাল জব্দ করা হয়েছে। জেলেরা অনেক সময় গভীর রাতে রেণু আহরণ করায় তা শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও আমরা সাধারণ জেলেদের সচেতন করার পাশাপাশি তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করছি। দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমাদের এই কঠোর অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।”

পরিবেশবাদীরা বলছেন, কেবল অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। একদিকে যেমন ফড়িয়া ও মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে, অন্যদিকে প্রান্তিক জেলেদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান বা সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় দাকোপের নদ-নদীগুলো অচিরেই মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।