উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোর ওক্সাকা (Oaxaca) রাজ্যের পাহাড়ি বনের গভীরে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় গ্রাম, যার নাম ‘তিলতেপেক’। গত কয়েক দশক ধরে এই গ্রামটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘অন্ধদের গ্রাম’ হিসেবে। বহুকাল ধরে প্রচলিত ছিল যে, এই গ্রামে এক অদ্ভুত অভিশাপ নেমে এসেছে। এখানে কোনো শিশু সুস্থ চোখ নিয়ে জন্ম নিলেও, সময়ের সাথে সাথে সে তার চোখের আলো হারিয়ে ফেলে। কিন্তু লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই রহস্যময় গ্রামের আসল সত্যটা কী? এটি কি আসলেই কোনো অলৌকিক অভিশাপ, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ? আলোহীন এক জনপদ এবং ‘ডাইনি গাছের’ মিথ
তিলতেপেক গ্রামে ‘জাপোটেক’ (Zapotec) আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০০ মানুষের বসবাস। এই গ্রামের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, এখানকার কোনো ঘরেই রাত হলে আলাদা করে আলোর ব্যবস্থা করা হয় না। কারণ, আলো আর অন্ধকারের তফাত করার ক্ষমতা এই গ্রামবাসীদের নেই। প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছেন একাধিক দৃষ্টিহীন মানুষ।
যুগ যুগ ধরে স্থানীয় গ্রামবাসীদের বিশ্বাস ছিল, এই অন্ধত্বের পেছনে রয়েছে একটি প্রাচীন গাছের অভিশাপ। তাদের মতে, গ্রামে ‘লা লাভাফুয়েলা’ (La Lavajuela) নামের একটি রহস্যময় গাছ রয়েছে। স্থানীয়দের অন্ধ বিশ্বাস ছিল, কোনো মানুষ বা পশুপাখি যদি ভুল করেও ওই গাছটির দিকে তাকায়, তবে সাথে সাথেই তার চোখের দৃষ্টি চলে যায়। আর এই ভয়ে গ্রামের কেউ ওই গাছের ধারেকাছেও ঘেঁষত না। এমনকি বহির্বিশ্বে এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়েছিল যে, এই গ্রামের কুকুর, বিড়াল কিংবা গবাদি পশুরাও অন্ধ হয়ে যায়।
কুসংস্কারের বেড়াজাল ভাঙলো বিজ্ঞান
সত্যিই কি কোনো গাছ মানুষকে অন্ধ করতে পারে? এই রহস্যের জট খুলতে মেক্সিকান সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গবেষক ও বিজ্ঞানীরা তিলতেপেক গ্রামে অনুসন্ধান চালান। আর তখনই বেরিয়ে আসে এক চমকপ্রদ ও ভয়ানক সত্য। কোনো ভূত-প্রেত বা অভিশপ্ত গাছ নয়, এই গণ-অন্ধত্বের পেছনে দায়ী ছিল ছোট্ট একটি মাছি!
বিজ্ঞানীরা জানান, তিলতেপেকের ঘন জঙ্গলে ও নদীর অববাহিকায় এক ধরণের বিষাক্ত কালো মাছি বংশবৃদ্ধি করে, যার নাম ‘ব্ল্যাক ফ্লাই’ (Black Fly)। এই মাছি যখন কোনো মানুষকে কামড়ায়, তখন তাদের লালার সাথে ‘অনকোসার্কা ভলভুলাস’ (Onchocerca volvulus) নামের এক ধরণের সুক্ষ্ম পরজীবী কৃমি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
এই পরজীবীটি রক্তের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের চোখের মণি এবং অপটিক নার্ভকে আক্রমণ করে এবং একপর্যায়ে নার্ভটি পুরোপুরি বিকল করে দেয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ভয়ংকর রোগটিকে বলা হয় ‘রিভার ব্লাইন্ডনেস’ (River Blindness) বা নদী অন্ধত্ব। আর পশুপাখিদের অন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ছিল মূলত একটি অতিরঞ্জিত গুজব।
অন্ধকারের অবসান, নতুন ভোরের আলো
রোগের আসল কারণ চিহ্নিত করার পর মেক্সিকো সরকার এই গ্রামে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশেষ অভিযান শুরু করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় গ্রামবাসীদের নিয়মিত পরজীবী নাশক ওষুধ খাওয়ানো হয় এবং ওই বিশেষ মাছি দমনের জন্য কীটনাশক ব্যবহারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ তিলতেপেক গ্রামটি অনেকটাই অভিশাপমুক্ত। বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা এখন আর অন্ধ হচ্ছে না। দীর্ঘদিনের অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে তিলতেপেকের নতুন প্রজন্ম এখন সুস্থ চোখ নিয়ে পৃথিবীর আলো দেখছে, স্কুলে যাচ্ছে।
তিলতেপেক গ্রামের এই গল্পটি প্রমাণ করে, কুসংস্কার যেখানে মানুষকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে ঠেলে দেয়, বিজ্ঞান ও সঠিক তথ্য সেখানে আলো জ্বেলে মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে।
















