বাংলাদেশে মেয়েশিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ভয়াবহ ঘটনার কারণে পরিবার ও সমাজে এই প্রশ্ন আরও বড় হয়ে উঠেছে— শিশু আসলে কতটা নিরাপদ এবং কোথায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
অনেক সময় শিশুরা খুব পরিচিত পরিবেশেও নির্যাতনের শিকার হতে পারে। ছোটবেলায় আত্মীয় বা পরিচিত কারও দ্বারা ঘটে যাওয়া এমন ঘটনা অনেক সময় শিশুর মনে গভীর ভয় ও ট্রমা তৈরি করে, যা তারা বড় হলেও ভুলতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুদের প্রতি সহিংসতার বড় একটি অংশ ঘটে পরিচিত মানুষের মাধ্যমে। অর্থাৎ, অপরিচিত কেউ নয়, বরং আত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিবারের ঘনিষ্ঠ কেউ অনেক সময় এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে। এই বাস্তবতায় পরিবারগুলোকে আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন।
সম্প্রতি রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে দেখা গেছে, ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরে একটি ফ্ল্যাটে শিশুটিকে প্রথমে টয়লেটে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এরপর গলা কেটে হত্যা করা হয়। তার মাথার অংশটি পাওয়া যায় টয়লেটে এবং শরীরের বাকি অংশ উদ্ধার করা হয় খাটের নিচ থেকে।। এমন ঘটনা মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, কারণ এটি প্রমাণ করে যে নিরাপদ বলে মনে হওয়া পরিবেশও সবসময় নিরাপদ নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের মতে, শিশুরা অনেক সময় নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করতে পারে না, তাই তারা সহজ নিশানা হয়। অপরাধীরা এই দুর্বলতাকে কাজে লাগায়।
শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার কী করতে পারে
এই ধরনের নির্যাতনের ফলে শিশুদের মধ্যে গভীর মানসিক প্রভাব পড়ে। তারা বিষণ্ণ হয়ে যেতে পারে, আত্মবিশ্বাস হারাতে পারে, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে এবং পড়াশোনায় আগ্রহও হারাতে পারে। অনেক সময় শিশুরা অস্বাভাবিক ভয়, উদ্বেগ, একা থাকতে না চাওয়া বা মানুষের প্রতি অনাস্থার মতো সমস্যায় ভোগে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, এমন অভিজ্ঞতার কারণে শিশুরা দীর্ঘমেয়াদে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা নিজেদের দোষী ভাবতে শুরু করতে পারে, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— শিশুকে দোষ না দেওয়া এবং তাকে নিরাপদ ও সমর্থনমূলক পরিবেশ দেওয়া। শিশুর আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত এবং তার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা প্রয়োজন। প্রয়োজনে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নিতে হবে।
শিশুদের সুরক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, অভিভাবকদের আগেভাগে সচেতন হতে হবে। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে কোন স্পর্শ গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি নয়। তাকে ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে।
শিশুকে এটাও শেখাতে হবে যে, কোনো স্পর্শে অস্বস্তি লাগলে সে সঙ্গে সঙ্গে ‘না’ বলতে পারবে এবং দ্রুত বাবা-মা বা বিশ্বাসযোগ্য বড়দের জানাতে পারবে। এছাড়া অপরিচিত বা সন্দেহজনক কারও সঙ্গে একা না যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করা জরুরি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব শিক্ষা ভয় দেখিয়ে নয়, বরং সহজ ও বন্ধুসুলভভাবে দিতে হবে, যাতে শিশু বুঝতে পারে এবং স্বাভাবিকভাবে আত্মরক্ষা করতে শেখে।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, শিশু সুরক্ষায় শুধু পরিবার নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা ও ভবিষ্যৎ ক্ষতির ভয়ে পরিবারগুলো ঘটনা গোপন করে, যা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে, যেখানে ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান আছে। তবে বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত ধীরগতিতে হয়, চার্জশিট দিতে দেরি হয় এবং বিচার দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে।
শিশু সুরক্ষায় বাংলাদেশে মূলত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন। এই আইনটি প্রণয়ন করা হয় শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বিশেষ করে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
২০০০ সালের আগে ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলায় জরিমানা সবসময় বাধ্যতামূলক ছিল না। কিন্তু নতুন এই আইনে জরিমানা বাধ্যতামূলক করা হয় এবং শাস্তির মাত্রাও আরও কঠোর করা হয়।
আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি ধর্ষণ করে বা ধর্ষণের পর এমন কোনো কাজ করে যার ফলে ভুক্তভোগী নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থদণ্ডও আরোপ করা যায়।
আইনে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো নারী বা শিশুর ক্ষেত্রে সম্মতি ছাড়া, ভয় দেখিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা হয়, তাহলে সেটিও ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি শিশুর ক্ষেত্রে বয়স কম হওয়ার কারণে সম্মতি থাকলেও সেটি আইনগতভাবে বৈধ ধরা হয় না।




















